ইসলামের দৃষ্টিতে সুবিচার

অধ্যাপক মাওলানা সাইফ উদ্দিন আহমদ খন্দকার ||

সুবিচার রাষ্ট্র বা সমাজের এমন একটি মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার অনুপস্থিতিতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। আর এই একটিমাত্র কারণে জনগণের জানমাল, ইজ্জত-সম্মান সবকিছু ধুলায় মলিন হয়ে যেতে পারে। সুবিচার রাষ্ট্র বা সমাজে জনগণের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান, পরিধি ও দায়িত্বানুযায়ী সুবিচারের মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে।

জনগণের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ইসলামে বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। এ সম্বন্ধে কোরআন ও হাদিসে বিশেষ তাকিদ রয়েছে। কুরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছেঃ তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়-পরায়নতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট। (সূরা নিসা, আয়াত ৫৮) অপর এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ ন্যায় পরায়নতা, সদাচারের নির্দেশ দেন। (সূরা নাহল, আয়াত ৯০)।

ইমাম রাগিব ইস্পাহানি রহ. বলেন, ‘আদাল’ অর্থ বিচারের ক্ষেত্রে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে সমান সমান করা, অর্থাৎ ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ এই নীতিতে বিচার কার্য সম্পাদন করা। শায়খ আবুল বাকা র. এর মতে আদল শব্দটি জুলুমের বিপরীত। এর অর্থ হল যার যা প্রাপ্য যথাযথভাবে তাকে তা দেওয়া।

কোরআন মজীদে আরসাদ হয়েছে- হে মুমিনগণ তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষী স্বরূপ, যদিও তার তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে হয়, সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহর উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যয় বিচার করতে প্রকৃতির অনুগামী হবে না। যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে যাও তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তাঁর সম্যক খবর রাখেন। (সূরা নিসা -১৩৫)

ন্যায়বিচারের প্রতিদান এবং অন্যায় বিচারের পরিণাম প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম ইরশাদ করেন- বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার বিচারক জান্নাতি হব। আর দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামী হব। জান্নাতি বিচারক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে হক (সত্য) জেনে সে মোতাবেক ফয়সালা করেছে। যে ব্যক্তি হক জানা সত্ত্বেও আদেশ দানের ক্ষেত্রে অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেছে সে হবে জাহান্নামী। তিনি আরো এরশাদ করেন, বিচারক অন্যায় না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। যখন সে জুলুম করে তখন আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন না এবং শয়তান তার সঙ্গী হয়ে যায়। (আবু দাউদ )

মূল কথা হচ্ছে, ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত এবং আপন-পরের মধ্যে কোন পার্থক্য বা তারতম্য নেই। রাসূলুল্লাহ সা. স্বার্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন, হে মানব মন্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। এ জন্য যে, তাদের কোনো সম্মানিত লোক চুরি করলে তখন তারা তাঁকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোন দুর্বল লোক চুরি করতো তখন তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মোহাম্মদ সাল্লালাহ সালাম এর কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে, তবে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ তার হাত কেটে দিবেন। আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান। কেউ এর থেকে ঊর্ধ্বে নয়। আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর রা. তার খিলাফতকালে আপন পুত্র আবু শাহ্মাকে মদ্যপানের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হলে দণ্ড প্রদান করেন। (বোখারী শরীফ)

বিচারক নিয়োগ ও বিচারর নীতিমালা :  আইন-কানুন যতই নিখুঁত হোক না কেন উপযুক্ত বিচারকের উপরেই এর কার্যকারিতা নির্ভর করে। বস্তুত বিচার ব্যবস্থা রাসূল সা. এর যুগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. হযরত আলীকে ইয়ামেনের কাজী (বিচারক) নিয়োগ করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাকে ইয়ামেনের কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করে পাঠানোর প্রাক্কালে আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন অথচ আমার বয়স অল্প। বিচার সম্পর্কে আমার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তখন রাসূল বললেন, আল্লাহ তায়ালা অচিরেই তোমার অন্তরে হেদায়েতের নূর পয়দা করে দেবেন এবং তোমার জবানকে সুদৃঢ় করে দিবেন। যখন তোমার সামনে বাদী-বিবাদী উপস্থিত হয়ে বিচার প্রার্থনা করবে তখন তুমি দ্বিতীয় পক্ষের মতামত না শুনে প্রথম পক্ষের অনুকূলে রায় ঘোষণা করবে না। কেননা দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য তোমাকে মামলার প্রকৃতি উপলব্ধিতে ও সঠিক রায়দানের সাহায্য করবে। হযরত আলী বলেন, এরপর থেকে কখনো আমি বিচার নিষ্পত্তির ব্যাপারে দ্বিধা সংশয়ে পতিত হইনি। (বায়হাকী)

বিচার কার্যের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিমালার প্রতি লক্ষ রাখা ও বাস্তবায়িত করা আবশ্যক।
১. বিচারকের নিকট পৌঁছাতে কোন প্রকারের প্রতিবন্ধকতা যেন না থাকে।
২. বাদী-বিবাদী উভয়ের প্রতি ছোট বড় প্রত্যেক বিষয়ে সমান ব্যবহার করা।
৩. কাজী মসজিদে বা বাড়িতে এমন কোন স্থানে বসে বিচার করবেন যেখানে প্রবেশ করার ব্যাপারে সকলের জন্য অনুমতি রয়েছে।
৪. বিচারক কারো হাদিয়া গ্রহণ করবেন না।
৫. বিচারক কারো বিশেষ দাওয়াতে অংশগ্রহণ করবেন না।
৬. বাদী-বিবাদীদেরকে বসানো, তাদের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা, কিংবা সংকেত দান অথবা দৃষ্টি দানের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের প্রতি সমতা বজায় রাখবেন।
৭. কোন এক পক্ষের সাথে গোপন আলাপ, উচ্চস্বরে কথা বার্তা বলা, মুখোমুখি হাসা, তাদের সম্মানে দাঁড়ানো এ জাতীয় কোনো আচরণ করবেন না।
৮. বিচার মঞ্চে বসে ঠাট্টা-মশকরা করবেন না।
৯. সাক্ষী কেমন করে সাক্ষ্য বাক্য উচ্চারণ করবে তা শেখাবে না।
১০. বিচারকের জন্য ক্রোধান্বিত হওয়া বা খুঁতখুঁতে মেজাজে হওয়া অনুচিত। এ অবস্থায় বিচার কার্য সম্পাদন করতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, কোন হাকিম (বিচারক) ক্রোধান্বিত অবস্থায় দুই ব্যক্তির মধ্যে ফয়সালা করবেন না। (বুখারী ও মুসলিম)
১১. আদালত কক্ষে এমন কোনো কথাবার্তা না হওয়া বাঞ্চনীয় যাতে কোনো পক্ষের প্রতি জোর-জবরদস্তি প্রমাণিত হয়।
১২. মহিলা ও পুরুষের সাক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন স্থানে শ্রবণ করা বাঞ্চনীয়।
১৩. কোন বিষয় পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত রায় ঘোষণা না করা।
১৪. বিচারকের আসনে বসে উপদেষ্টাদের থেকে মতামত গ্রহণ না করা বাঞ্ছনীয়।
১৫. বিচারকের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে সর্বকাজে আল্লাহর হুকুম ও রাসুল সা. এর আদর্শের প্রতি লক্ষ্য রাখা। তবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। (মুসলিম শরীফ)। সুতরাং, নাগরিকের জন্য সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার কার্যের সকল স্তরে স্বচ্চতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, অধ্যক্ষ, দারুল আজহার মডেল মাদরাসা, ঢাকা।