উত্তাল ঢেউ দেখে আপনি ঘাবড়ে যাবেন না, নিজ জীবন সংগ্রামের উপর আত্মবিশ্বাসী হোন!

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ ||

প্রিয় মামুন ভাই!
নিশ্চয় এই সময়ের একেকটি মুহূর্ত অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় পার করছেন। আশা করছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার উপর আরোপিত এই পরীক্ষার ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই সমাপ্তি হবে। আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে কখনো ভয়, কখনো বিপদ, মসিবত দিয়ে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তায়ালা এই কঠিন ফেৎনা থেকে আপনি ও আপনার পরিবার এবং সবাইকে হেফাজত করুন।

বিগত কদিন আগে আপনার ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের ঝড়বয়ে গেল এবং এখনও যাচ্ছে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে কোন রাজনৈতিক দলের নেতা, কোন বড় আলেম কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের উপর এমন তুফান বয়ে চলার ইতিহাস বিরল৷ আপনার ব্যক্তিগত জীবন-চরিত্র নিয়ে যে নোংড়া খেলা শুরু করেছে চাটুকার মিডিয়া, এমন নজির সমকালিন ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই মুহূর্তে যদি আপনি চুপ থাকতেন তাহলে সমস্যা এমনি সমাধান হয়ে যেত। আত্মঘাতী ‘লাইভ’ আপনার জন্য চরম ক্ষতি বয়ে আনছে।

আপনার কিছু বিষয় পছন্দসই নয়, অনেক বক্তব্যের বিষয়ে আমারো আপত্তি আছে। কিন্তু এখন আপনাকে অপমান করার যে লড়াইটি শুরু হয়েছে, এখানে যদি আপনি হেরে যান তাহলে হেরে যাবে হেফাজত, হেরে যাবে এদেশের ইসলামপন্থীরা। এখানে লড়াইটি ব্যাক্তি মামুনকে ঘায়েল করার জন্য নয় বরং ইসলামী চেতনাকে স্তব্ধ করে দেয়ার। আর এই দাবার ঘুটি বানানো হয়েছে আপনাকে, আপনার কিছু র্দুবলতাকে। তাই এখনি সচেতন না হলে আরো বড় ধরনের মাশুল ঘুনতে হবে কওম আর কওমীকে।

শ্রদ্ধেয়!
বর্তমান বাংলাদেশে সবচে আলোচিত ব্যক্তি আপনি। আপনার মহান পিতার পরিচয়, আপনার ইলম এবং আপনার সাহসী বক্তব্য আপনাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলতে সাহায্য করেছে। কওমি অঙ্গন ছাড়িয়ে আপামর জনসাধারণের মাঝেও আপনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। আপনি যেখানেই যান সেখানেই মানুষজন পঙ্গপালের মতো ছুটে যায়। আপনি কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন তা আপনি নিজেও হয়তো ঠাহর করতে পারেননি৷ নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে যে বিচক্ষণতা আর কৌশলী হওয়ার কথা ছিল সেটি হননি। আপনি নিজেই নিজের মূল্যায়ন করতে পারেননি। নিজেকে নিজে চিনতে ব্যর্থ হয়েছেন।

প্রিয়!
আপনি আজ খ্যাতির বিড়ম্বনার শিকার৷ আপনার সম্মান, মর্যাদা, আপনার যোগ্যতা, সাহস, ব্যক্তিত্ব ও ইলমি যোগ্যতা আজ আপনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনার সহজ সরল কোমল সাদামাটা জীবন। আপনার সরলতার সুযোগেই আজ কঠিন ফাঁদ পাতা হয়েছে আপনাকে নাজেহাল করার জন্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দীর্ঘ ও সুপরিকল্পিত গভীর ষড়যন্ত্রের জালে আপনি আজ বিপর্যস্ত। আমি মনে করি, এই চক্রান্তের ফাঁদ তৈরী করা হয়েছে আপনার চারপাশ থেকেই। ঘরের ও বাইরের এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার আপনি। নারী দিয়ে সাজানো ফাঁদে পড়ে দুনিয়ার অনেক বিখ্যাত মানুষ ধুলায় মিশে গেছেন, সে ইতিহাস হয়তো আপনার জানা আছে। আমি মনে করি, ঝর্ণা ভাবিকে সেই জালের ট্র্যামকার্ড বানানো হয়েছে হয়তো আপনাকে বিধ্বস্ত করতে।

প্রিয় মামুন ভাই!
আপনি হয়তো এখন মানসিক ভারসাম্যহী অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। আপনার লাইভ, লেখা, ডিলেট আর কথার ধরণে এটি প্রকাশ পাচ্ছে। আপনি কেন, যেকোন ব্যক্তির উপর দিয়ে এমন ঝড়-তুফান আর গভীর ষড়যন্ত্র চললে সে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়াই স্বাভাবিক। তবুও আপনার সাহসের প্রসংশা করতে হয়। সেদিন আপনি হায়েনাদের সাথে যেভাবে একাকী লড়ে গেছেন সিংহের মতো, তা অবাক করার মতো। অন্য কেউ হলে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ভেঙ্গে পড়ত।

মামুন ভাই!
আজকের পরিস্থিতিতে আপনার পাশে অনেকেই নেই। আমরা লক্ষ্য করছি, গত কয়েক বছর ধরে একদল স্বার্থন্বেষী মহল নিজেদের পদ-পদবী আর কওমী অঙ্গনকে ব্যবহার করে নিজের আখের গোছানোর জন্য আপনাকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, আপনি গত কয়েক বছর ধরে আপনার নিজের সম্ভাবনাময় সংগঠন ছাত্র মজলিস, যুব মজলিস, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক ফিকির, পলিসি ও কার্যক্রমকে পাশ কাটিয়ে প্রোফেশনাল বক্তাদের নিয়ে খুব দৌড়ঝাপ করতে। এই বক্তারা আপনাকে ব্যবহার করেই তাদের মাঠ তৈরী ও হেফাজতের পদ-পদবী লাভের সিন্ডিকেট তৈরী করেছে। তারা মূলত আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। তারা মামুনুল হক সাহেবের উপর ভর করে নিজেকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই লম্ফঝম্ফ করেছে। এই তৈল মর্দনকারীদের কখনো আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী বা বিপদের বন্ধু মনে করা ঠিক হয়নি।

আপনি রিসোর্টে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার পরই আমরা লক্ষ্য করলাম, এমন একজন অরাজনৈতিক বক্তা যারা বসন্তের কোকিল হয়ে আপনার চারপাশে গত কয়েক বছর ধরে ঘুরাঘুরি করছেন, এমন একজন পোষ্ট দিলেন, আপনি নাকি বিগত কয়েকদিনের আন্দোলন সংগ্রামে বড্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন আর তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ভাবিকে নিয়ে দূরে কোথাও কোন রিসোর্টে একটু অবকাশে যেতে। আর এই রিসোর্টটি নাকি অনেক নিরাপদ ও পছন্দসই। আজকের এই ঘটনার পর এটি বলতে বাধ্য হলাম, আজকের এই কঠিন পরিস্থিতিতে আপনাকে কুপরামর্শ দিয়ে সোনারগাঁও পাঠিয়ে নাজেহাল করার পেছনে এই ‘বসন্তের কোকিলের’ কোন হাত আছে কিনা? এই সন্দেহ আরো গভীর হচ্ছে এই কারণে, আপনার উপর বিগত কয়েকদিনের এই ঝড়-তুফানে আমরা এই বসন্তের কোকিলদের আপনার পাশে দাঁড়াতে দেখিনি। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে, বড় বড় ব্যক্তিরা তাদের চারপাশের লোকদের ষড়যন্ত্রের দ্বারাই বেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

মামুন ভাই!
আমরা লক্ষ্য করেছি, এই দুঃসময়ে আপনার দলের কর্মীরা, আপনার রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা, হেফাজতের কিছু মুরুব্বি, সবকিছু ভুলে আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আপনার হাজার হাজার অবুঝ ভক্ত মাদরাসার ছাত্ররা গভীর ভালোবাসা থেকে আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, আপনার কৈশোরে তারুণ্যে যুব সময়ের মতোই আপনি স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছেন। আপনি আপনার কোন মুরুব্বির পরামর্শ নিচ্ছেন না। আমরা এটিও লক্ষ্য করছি, আপনার চারপাশে একদল অথর্ব ও অপদার্থ লোক রয়েছে। শব্দগুলো এজন্য বললাম, তারা আপনাকে বারবার লাইভে আসতে উৎসাহিত করে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে।

মামুন ভাই!
একটি তিক্ত সত্য বলি, আমার জানামতে এদেশে আপনার কোন মুরুব্বি বা ইসলাহি শায়েখ নেই, যার পরামর্শে ও নির্দেশনামত আপনি কদম কদম পথ চলেন। এটি একজন আলেমের জন্য কখনো কাম্য ছিল না। নেই আপনার কোন রাজনৈতিক উপদেষ্টা যিনি আপনাকে সঠিক পরামর্শ ও পথ দেখাবেন। আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক সহযোদ্ধা থাকার কথা থাকলেও আসলে এটিই বাস্তবতা, আপনাকে পরামর্শ দিয়ে রাহবারি করার মতো কোন সহযোদ্ধা আপনি তৈরী করেননি। আপনি নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে চলাকে পছন্দ করেছেন। এই বেপরোয়া চলাই আজ আপনার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার চারপাশে একটি রাজনৈতিক সচেতন মেধাবী তারুণ্যের টিম দরকার ছিল। যারা হবে আমনতদার, দীনদার, চৌকশ ও তাকওয়াবান। যারা আপনার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিবে কিন্তু আপনাকে ব্যবহার করে নিজের আখের গোছানোর ফন্দি করবে না। যাদের পরামর্শের বাইরে আপনার কোন স্বাধীন জীবন থাকবে না। কারণ আপনি আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, একটি আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন এদেশের দিকভ্রান্ত লক্ষ-কোটি তারুণ্যের। আপনি হয়ে উঠেছিলেন কওম ও কওমীর আইডল। কাজেই আপনার জীবন হওয়া উচিত ছিল, অন্য শতজনের চেয়ে ভিন্ন। আরো সতর্ক, আরো স্বচ্ছ, আরো জবাবদীহিমূলক, আরো পরিপাটি, আরো গোছানো, আরো সুন্দর, আরো পবিত্র।

প্রিয় হযরত!
কিন্তু হায় দুর্ভাগ্য! আজ আপনার এক অগোছালো, লুকোচুরি খেলার মতো, আলো-আঁধারীর ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন আপনার এক বিধ্বস্ত জীবন দেখলো গোটা জাতি। যা কখনো কাম্য ছিল না। কেবল একটু অসতর্কতার কারণে আপনার বৈধ স্ত্রীকে নিয়ে মিডিয়া যে গালগপ্প তৈরী করার সুযোগ পেলো, এটি আপনার মতো একজন আলেমের জন্য বড্ড বেমানান। অনেক বড় ক্ষতি আর অপমানের কারণ। কারণ আপনার এহানত মানে গোটা আলেমসমাজের এহানত।আপনার জীবন আরো তাকওয়াময় হবে এমনটিই ছিল এদেশের আপমার জনতার প্রত্যাশা।  আমরা এতটুকু আশা করি আপনার কাছে, আপনার বড় ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক সাহেব এদেশের এমন একজন চৌকশ বিরল ঠান্ডা মাথার মেধাবী আলেম যার তুলনা নেই। আমাদের অনুরোধ থাকবে, জীবনের উত্থান-পতনে অনেক ঝড়ই আসে। সব, সব ভুলে, সব ব্যাথা-বেদনা ঝেরে ফেলে দিয়ে আপনি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন। আর পরবর্তী জীবনে আপনি কমপক্ষে আপনার বড় ভাইদের, বিশেষ করে মাহফুজ সাহেবকে হলেও মুরুব্বি মেনে চলবেন। আপনি অকৃতজ্ঞ হবেন না, আপনার দুঃসময়ে কাছে ও দূরের যারা আপনার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে আপনার পরিবার ও আপনার দল, তাদের ঋণ আপনি ভুলবেন না।

আপনার ভাই-বোনেরা শায়েখ পরিবারের অনন্য উচ্চতা আর মান-সম্মানকে ধরে রাখতে আপনার গোপন বিয়ে, যা পরিবারে কেউ জানতো না, তারা নিসংকোচে মেনে নিয়েছেন। সবকিছু ভুলে আপনার পাশে সরাসরি দাঁড়িয়েছেন। মুহূর্তকাল দেরী করেননি আপনাকে এই কঠিন বিপদসংকুল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য। তারপরও যদি আপনি না বুঝেন! আপনার মতো করে চলেন!! সকাল বিকাল লাইভ চর্চা করেন!!! আর এমন করে পথ চলা অব্যাহত রাখেন, আল্লাহ না করুক, তখন হয়তো এমন একটি সময় আসবে যে, আপনার এই আবেগ, উত্তেজনা, পরামর্শহীন পথচলার কারণে আপনার পরিবার, প্রিয়জন, সংগঠন, ভক্তকুল কেউ আর আপনার পাশে দাঁড়ানোর মত সৎ সাহস পাবে না।

মামুন ভাই!
এসব বিষয়ে লাইভে আসার পূর্বে আপনার সহকর্মী প্রথিতযশা, প্রাজ্ঞ অনেক আলেম আছেন; উনাদের সাথে বসে কি বলবেন বা বলবেন না, বিষয়বস্তু ঠিক করার প্রয়োজন ছিল।  পার্লারে কাজ করা ওই নারী কি আপনার উপযুক্ত? তিনি কি মামুনুল হকের মর্যাদা বুঝবেন? নাকি আপনার বিরুদ্ধে মুখ খুলবেন? আপনার স্ত্রীর চেহারা আজ জাতি চিনে, তার হাতের লম্বা নখ, খিমাওয়ালা নিকাব বিহীন, হাত পায়ের মোজা ছাড়া বোরকা সব আজ সবাই জানে। এমন একজন নারী আপনার মতো শায়খুল হাদীসের স্ত্রী হবেন এটি আমরা কল্পনাও করিনি। এমন একজন নারী কেন শায়েখ পরিবারের বউ হবেন যিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ট হাদীস বিশারদ আপনার পিতা শায়খুল হাদীস আজীজুল হক রহ. এর নামই জানেন না। তিনি আপনা সম্মান কী বুঝবেন? এটি মানতে কষ্ট হচ্ছে।আপনাকে হয়তো তিনি ফাঁদে ফেলেছেন। এটি তকদিরের লেখা ছিল। আপনি যে জাহেলী সমাজের ভয়ে আপনার স্ত্রীর নাম গোপন করলেন, ২য় স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাসায় তুললেন না, এই জাহেলী সমাজের মানুষ কী আপনার শরীয়তি স্ত্রীর বিষয়টি বুঝবে? আপনার এই কাজগুলো করার আগে আপনার পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান অনুধাবন করা উচিত ছিল এবং আগামীতে আরো সতর্কতা কাম্য। আপনার মানবিক সহযোগিতা আজ কাল হয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু আপনি আমেনা ভাবীর সাথে তথ্য গোপন করে যে অবিচার করেছেন, একজন হাফেজা জাহেদা স্ত্রীকে কষ্ট দিলেন এটিও দুঃখজনক। তাকে খুশি করে দুই ভাবিকে সমানভাবে কাছে টেনে নিয়ে আপনার আগামি জীবনকে আরো প্রেমময়, সুখময় ও বিপ্লবী করে তুলবেন বলে আশা রাখি।

প্রিয় মামুন ভাই!
এই মুহূর্তে আপনার প্রতি পরামর্শ হলো,
১. এখন থেকে আপনি কথা কমিয়ে দিয়ে চুপ থেকে কাজে মনযোগী হোন। আপনার মাঝে এমন একটি সম্ভাবনা আছে, আপনি চাইলে বুদ্ধিদীপ্ত কাজের মাধ্যমে এদেশের বিশ্বাসী তরুণদের একক আইডল হয়ে উঠতে পারেন। এটি এদেশে সবার দ্বারা সম্ভব নয়, আপনার সেই সাহস, মেধা, প্রজ্ঞা আছে, যদি টিমওয়ার্ক কাজ করেন।

২. আপনার একজন চৌকশ, রাজনৈতিক প্রাজ্ঞ প্রেসসচিব প্রয়োজন। মিডিয়া আপনাকে যেভাবে কাভার দেয়, ফলো করে, আপনি প্রেসসচিবের মাধ্যমে আপনার কথাগুলো সম্প্রচারের ব্যবস্থা করবেন।ইউটিউভের ভিউ বাড়ানোর জন্য কেউ যেন মফস্বল থেকে উঠে এসে আপনার প্রেস সচিব হয়ে না উঠে!

৩. কথায় কথায় ফেসবুক লাইভ করা বন্ধ করুন। আমাদের মেজাজে শরীয়ত, আমাদের ঐতিহ্য, আপনার মতো একজন বিদগ্ধ শায়খুল হাদীসের দ্বারা এমন ঘনঘন লাইভ চর্চা বড় বেমানান। নাজুক পরিস্থিতিতে লাইভ চর্চা না করে আপনি সেজদায় পড়ে আসমানী ফায়সালা করালে আল্লাহ তাআলাই আপনার পক্ষে ফেরেস্তাদের লাগিয়ে দিতেন। জটিল বিষয় সহজ করে দিতেন। কিন্তু এখন সহজ বিষয় লাইভ চর্চার দ্বারা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

৪. রাজনীতির “ফেসবুক শাখা” আবেগী কর্মীতে ঠাসা, তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন। আপনার লাইভ হুঙ্কারে অপরিপক্ক কর্মী সমর্থকদের রক্ত গরম হচ্ছে ঠিক, কিন্তু মগজ বিকশিত হচ্ছে না। আর একদল বুদ্ধিমান কর্মী ছাড়া কেবল আবেগ ছড়িয়ে যে সফলতা লাভ করা যাবে না, এটি আমার চেয়ে আপনি ভাল বুঝেন আশা করি।

৫. লোকাল বাসের ড্রাইভারের মতো ধৈর্যের পাহাড় হতে হবে। যাত্রীরা কতো কথাই বলবে, তা কানে নিলেই এক্সিডেন্ট। আপনি দাঈ। আপনি কান বন্ধ করে আযান দিবেন। আপনি যদি নেট আর মিডিয়ার অপপ্রচারে প্রভাবিত হন তাহলে সামনের পথ আরো জটিল ও কঠিন হয়ে উঠবে। আপনি হাসিমুখে থাকবেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও আপনার মনোবল ভেঙ্গে গেছে এটি কাউকে বুঝতে দিবেন না। পরিস্থিতি যতোই জটিল ও আপনার বিরুদ্ধে যাক, আপনি হতাশ হবেন না। মানুষ যখন হতাশ হয় তখন আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। হতাশা বা মাইউসী এটি মানুষকে ধ্বংস করে শয়তানের পক্ষ থেকে।

৬. উত্তাল ঢেউ দেখে ঘাবড়ে গেলে নাবিকের জাহাজ তলিয়ে যাবে। আপনাকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে নিজের জীবন সংগ্রামের উপর। আপনি লাখো সমর্থকের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, সেখানে যদি আপনি আবেগী হয়ে উঠেন, ভেঙে পড়েন, তাহলে আপনার বিরোধী শক্তিশালী গোষ্ঠী আপনার উপর আরো বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আক্রমন করবে।

৭. আপনি জাতীয় নেতা হিসাবে সংকীর্ণতা বাদ দিয়ে সবাইকে নিয়ে চলার মানসিকতা রাখবেন। চরমোনাই, তাবলীগ, জমিয়ত, এমন কোন মত ও পথ নেই যেখানে আপনার ভক্ত নেই। আপনাকে পছন্দ করে, অনুসরন করে এমন মানুষ নেই। আপনিও যদি সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতো কিংবা কওমী মাদরাসার চারদেয়ালে আবদ্ধ আলেমদের মতো যে কারো কথায় যে কারো বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়েন, তাহলে এটি আপনার অবস্থানের সাথে কোনভাবেই মাননসই নয়।কোন গোষ্ঠী যেন নিজেদের আখের গোছানোর জন্য আপনার সাহসী উচ্চারণ আর তর্জন-গর্জনকে ব্যবহার করতে না পারে। হোন না কেন তিনি কাকরাইলের ইমাম। তার জন্য আপনি কেন আরেকজনকে চোখ রাঙিয়ে আপনার পথচলাকে সংকোচিত করবেন।

কারণ সব মহলেই আপনাকে পছন্দ করে এমন লোক রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার পিতা শায়খুল হাদীস রহ. আপনার আদর্শ হতে পারেন। তিনি কোনদিন ধর্মীয় ইস্যুতে কোন মুসলমানের জামাতের বিরুদ্ধে হুংকার ছাড়েননি। আপনার হুঙ্কারে আবেগী সমর্থকদের যে জুলুম শুরু হয়, এর বদদোয়া আপনার উপরই পড়বে। মনে রাখবেন, মজলুমের বদ দোয়া থেকে বাঁচা এটি জীবনের অনেক বড় একটি সফলতা। এখন আপনার সামনে বড় করণীয় হচ্ছে, কওমি এবং কাছাকাছি মতাদর্শের ইসলামপন্থীদের সাথে ঐক্য গড়া। চরমোনাইয়ের সাথে আলোচনা করে হেফাজতে স্থান দেওয়া। তাবলীগের বৃহৎ একটি অংশ আপনাদের থেকে দূরে, তাদের কাছে টেনে আনা। এগুলো আপনার জনপ্রিয়তাকে আরো বাড়িয়ে দিবে ইনশাআল্লাহ।

৮. আপনার সবচে প্রথম বিষয় হলো, আপনার সংগঠন। দিনশেষে এরাই আপনার মূল পুজি। আপনার মূল হিতাকাঙ্ক্ষী। আপনার মূল জনশক্তি। আপনার বিপ্লবের সহযোগী। এরাই আপনার পাশে থাকবে। তাই নিত্য নতুন সংগঠন আর আবেগী আন্দোলন, হুজুগী মাঠ গরমের পেছনে না দৌড়ে আপনি আপনার সংগঠনকে মজবুত ও শক্তিশালী করুন। বুদ্ধিভিত্তিক কাজের মাধ্যমে সংগঠনকে এদেশের গণমানুষ ও তারুণ্যের হৃদয়ের গহীনে নিয়ে যান। এটি চাইলেই আপনার দ্বারা সম্ভব।

৯. আপনার জন্য যারা একটু এগিয়ে আসবে, তাদেরকে মূল্যায়ন করবেন। বিপদ কেটে গেলে কখনো তাদের ভুলে যাবেন না। সামর্থ্য বিবেচনা করে কথা বলবেন। কী প্রয়োজন বড়বড় হুংকার ছুড়ে বিপদ টেনে এনে আবার সুর বদলানোর? কারো কথার দ্বারা, আবেগ দ্বারা আপনি কখনো উত্তেজিত হবেন না। কারো স্বার্থে আপনি ব্যবহার হবেন না। কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাউকে হেয় করবেন না। আপনি সবার, সবাই আপনার।

১০. যে বোঝা আপনি কিংবা আপনার কর্মীরা বইতে পারবে না, সে বোঝা নিজেদের কাঁধে চাপাবেন না। চারপাশের অবুঝ ও আবেগী কর্মীদের উত্তেজনাকে দূরদর্শিতার দ্বারা প্রশমিত করবেন। আবেগী কর্মী নয়, দূরদর্শী শিক্ষিত উদারপন্থী কর্মী তৈরী করুন।উগ্র চিন্তার ও অন্যের সমালোচনা করে এমন কর্মী থেকে নিজেকে দূরে রাখুন, সময়ের ব্যবধানে সেও আপনার সমালোচনা করবে। আল্লাহ আপনার মঙ্গল দান করুন। সবর্দিক দিয়ে আপনাকে হেফাজত করুন, সকল ভুল ক্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে আপনাকে সম্মানিত করুন। আপনার পরিবার পরিজন ও দেশ-জাতি এবং মুসলিম উম্মাহকে হেফাজত করুন। আমিন।

আপনার কল্যানকামী
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
লেখক,গবেষক ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা