উপলব্ধি ও অভিমত

মুহিব খান ||

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ একটি অরাজনৈতিক আদর্শিক সংগঠন। আদর্শিক সংগঠনে ব্যক্তিবিশেষের গুরুত্ব আছে, তবে তা সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভরশীল নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংঘাত নয়, সংলাপের মাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে ন্যায়-সঙ্গত বোঝাপড়া হওয়া দরকার। পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়াও অবলম্বন করা দরকার। কোন প্রকার গুজব ছড়ানো বা বিশ্বাস করা মোটেও উচিত নয়।

ইস্যু-কেন্দ্রিক ও মৌসুম-ভিত্তিক কর্মসূচির বাইরেও সারাবছর সংগঠনের নিয়মিত চিন্তা, গবেষণা, বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা, প্রচার, মতবিনিময়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনকল্যাণ ও গঠনমূলক ব্যাপক কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কৌশল ও কূটনৈতিক জ্ঞান-সম্পন্ন চিন্তাশীল দূরদর্শী ব্যক্তিদেরকে নামমাত্র পদে অচল বসিয়ে না রেখে নেতৃত্বের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের প্রথম সারিতে রাখা উচিত এবং হকপন্থী সকল তরিকা ও ঘরানার উলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থী বিশিষ্ট নাগরিকদেরকে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ও পরিবেশ করে দেয়া উচিত।

সংগঠনের গঠনতন্ত্র, কর্মকৌশল ও দাবি-দফা দেশ, বিশ্ব ও সময়ের চলমান বাস্তবতার নিরিখে পুনঃমূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। এবং যেকোনো প্রসঙ্গে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সরকার ও সুশীল শ্রেণীর সঙ্গে যৌক্তিক আলাপ-আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং এর জন্যে সীমিত সংখ্যক যোগ্য ও বাছাইকৃত সদস্যের একটি টিমও নিয়োজিত রাখা প্রয়োজন। যারা নানা ধর্মীয় ও জাতীয় ইস্যুতে সরকারের প্রতি সুপরামর্শক ও সহায়কের ভূমিকা পালন করবেন। সারাদেশের সক্রিয় ও দায়িত্ববান নেতা-কর্মীদেরকে তালিকাভুক্ত করে নিয়মিত কর্মশালার মাধ্যমে আরো বেশি সুশৃংখল সুনিয়ন্ত্রিত সচেতন সুবিবেচক আধুনিক ও বাস্তব-জ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা উচিত।

কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের অফিস ব্যবহার নয় বরং বিপুল জনপ্রিয় অরাজনৈতিক এই জাতীয় সংগঠনটির স্বতন্ত্র কার্যালয় ও ঠিকানা থাকা প্রয়োজন এবং এর অরাজনৈতিক অবস্থান ও চরিত্র সর্বাবস্থায় অক্ষুণ্ণ রাখা প্রয়োজন। সরকার গঠন বা পতন এর কাজ নয়। এর জন্যে দেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর নিজ নিজ ব্যানারে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ আছে। চাইলে কোন রাজনৈতিক ব্যানারে সবাই জোটবদ্ধও হতে পারেন। সেই সব ইসলামী রাজনৈতিক দল বা জোটের সমর্থনে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পেশাজীবী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মতই মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকগণও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সাংবিধানিক অধিকার রাখবেন। আর হেফাজতে ইসলামকে আসলে রাজনীতিমুক্ত রাখাটাই প্রয়োজন, রাজনীতিবিদমুক্ত নয়।

অপরদিকে সরকারকেও সকল বিষয়ে বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত আইনানুগ পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে নিরপরাধ নেতাকর্মীদেরকে শীঘ্রই সসম্মানে মুক্ত করে দিতে হবে এবং করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশের সকল মক্তব হিফজখানা ও মাদ্রাসা খুলে দিতে হবে। অন্যথায় পুরো অভিযানটি জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান বা ঢালাও দমন-পীড়ন কোন আদর্শিক শক্তির গতিরোধ করতে পারলেও নির্মূল করে দিতে পারে না বরং আরও বেশি সাহসী ও শক্তিশালী করে তোলে।

কোন আদর্শের পক্ষের কর্মী-সমর্থকরা বিশেষ পরিস্থিতিতে সাময়িক স্তব্ধ, শঙ্কিত বা বিব্রত হলেও কখনোই স্বপক্ষ ত্যাগ করে না, নিঃশেষও হয়ে যায় না, সবাই মিলে দেশ ছেড়ে চলেও যায় না বরং নীতি ও নেতৃত্ব সংস্কার করে আরও বেশি সতর্ক, সুবিন্যস্ত ও সুকৌশলী হয়ে ওঠে। এ জাতীয় দমন অভিযান তোড়জোর করে শুরু করা গেলেও অনুকূল পরিস্থিতিতে শেষ করা সহজ হয় না বরং এর বিরূপপ্রতিক্রিয়া বিপুল সংখ্যক ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীকে ভেতরে ভেতরে চরম বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী করে তোলে। যা পরবর্তীতে হিতে বিপরীত হয়ে দেখা দেয়।

রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ওলামা-জনতার এই বৃহত্তর জাতীয় শক্তিকে অবধারিতভাবে মুখোমুখি অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হলে দেশে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে। কেননা দেশপ্রেমিক ঈমানদার এই বিপুল জনগোষ্ঠী এ দেশেরই নাগরিক এ মাটিরই সন্তান। এদের দেশপ্রেম ও ঈমানী চেতনা দুর্বিনীত। ছাইচাপা দিলেও সময়ে তা যে কোনো নামে বা পরিচয়ে দাও দাও করে জ্বলে উঠবে। কাজেই দেশী বিদেশী কোন সুযোগসন্ধানী, মধ্যস্বত্বভোগী মহলের প্ররোচনায় অনমনীয় দমননীতি গ্রহণ না করে সংলাপ, সমঝোতা, উদারতা ও দ্বন্দ্ব নিরসনের পথ অবলম্বন করাই সংকট সমাধানের সহজ উপায় এবং তুলনামূলকভাবে সবার জন্যে সবদিক থেকে নিরাপদ।

নেতৃত্বের একান্ত ব্যক্তিগত ভুল বা অনিয়মের দায় সংগঠনের নয়। তবে তা ইসলামী শরিয়া ও নৈতিকতার গুরুতর লংঘন বলে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলে এ ব্যাপারে ইসলামী সংগঠনের দায় ও করণীয় অবশ্যই আছে এবং তা কঠোরভাবেই করা উচিত। তবে অভিযোগের বিষয় শরিয়াসম্মত অথচ দেশীয় আইন ও সামাজিক প্রথাবিরোধী প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি তা আইনি প্রক্রিয়ায় নিজ দায়িত্বেই মোকাবেলা করবেন। আর অভিযোগ নিতান্তই ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হলে সংগঠন এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ ও প্রতিকারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার অধিকার রাখে।

হামলা মামলা জেল জুলুম মোকাবেলায় ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করাই অধিক কার্যকর। কোনরকম সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা মোটেও কাম্য নয়। আদর্শিক সংগঠন অশান্তি ও বিশৃঙ্খলায় বিশ্বাসী নয়। অন্যায় বা অন্যায়কারীর অন্ধ পক্ষপাতিত্বেও বিশ্বাসী নয়। তবে সেক্ষেত্রে প্রতিটি অভিযোগের প্রকৃত অপরাধী ও জড়িত ব্যক্তিদেরকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সুস্পষ্ট প্রমানসহ চিহ্নিত করতে হবে। নিরপরাধের উপর দায় চাপানোর পরিণাম কখনই শুভ হয় না।

অভিযুক্ত এবং পূর্ব থেকে সক্রিয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উচিত ২০১৩ সাল থেকে আনীত নাশকতা ও গোপন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগসমূহকে চ্যালেঞ্জ করে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের সততা ও স্বচ্ছতা প্রমাণ করে সাধারণ নেতা-কর্মী ও জনমনের দীর্ঘদিনের দ্বিধা-সংশয় দূর করা এবং শাপলা ট্রাজেডিসহ সাম্প্রতিক আন্দোলনে দাবীকৃত হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রামান্য বিবরণ জাতির সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে দেশের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র ও আদালতের কাছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিচার দাবি করা। সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা আদালত যদি ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষ আচরণ না করেন- তবে সময় ও পরিস্থিতিই উপযুক্ত করণীয় নির্ধারণ করে দেবে। দেশের মানুষ বোকা নন, আল্লাহর অমোঘ ফায়সালাও দূরে নয়।

সকল পরিস্থিতিতে মনোবল স্থির রাখতে হবে। কারো উস্কানি বা প্ররোচনায় নয়, বাস্তবতার আলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে সংকট অতিক্রম করতে হবে। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকেই সংকট মোকাবেলার নানারকম অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, প্রকৃত বন্ধু ও শত্রুকেও চিনে নেয়া যায় এবং নেতৃত্বের যোগ্যতা-অযোগ্যতাও প্রমাণিত হয়।

মোদ্দাকথা, হেফাজতে ইসলাম যদি সৎ স্বচ্ছ ও যোগ্য নেতৃত্বে সঠিক পথে পরিচালিত হয় তাহলে দেশী-বিদেশী কোন বাধাই এর চূড়ান্ত গতিরোধ করতে পারবে না এবং সবকিছুর শেষ ফলাফল দেশপ্রেমিক ঈমানদার গণমানুষের পক্ষেই আসবে, ইনশাআল্লাহ। আর যদি এর ভেতরে কোন বিচ্যুতি ও ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়, তবে একে অবশ্যই পরিশুদ্ধ ও পুনর্গঠন করে নিতে হবে। হোক তা নেতৃত্বে, হোক তা কর্মকৌশলে। মনে রাখতে হবে, সত্যই শক্তি, ধৈর্যই কৌশল, ঐক্যই বিজয়। “فان مع العسر يسرا ان مع العسر يسرا”