ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ : মানবজাতির জন্য শিক্ষা

ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন ||

আজকের দিনটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি বিশেষ দিন। এই দিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে ৭-৮ ঘন্টার মত ড. ইয়াসির ক্কাদি’র টক শুনেছি। সেই সময় আসলে পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং এখান থেকে কি শিক্ষনীয় আছে। এই দিনটি (১৭ রামাদান) ইসলামের জন্য ক্রিটিক্যাল ছিল। বদরের যুদ্ধে হেরে গেলে পৃথিবী থেকে ইসলাম ধর্ম বিলীন হয়ে যেত। হযরত মুহাম্মাদ সা. এবং সাহাবীরা এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। পরিস্থিতির কারনে আল্লাহর ইচ্ছায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল।

 হযরত মুহাম্মাদ সা. নিজে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হন যে মক্কা থেকে আগত সুসজ্জিত বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে হবে। লিডার হিসেবে এই বিষয়টি জানাতে মিটিং করেন। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। সাহাবীদের মত জানতে চান। মক্কা থেকে আসা সাহাবীরা (মোহাজিরিন) প্রফেটের সাথে একত্বতা ঘোষণা করলেন। কিন্তু মদিনাবাসীরা (আনসার) কনফিউজড হয়ে যান। তারা হযরত মুহাম্মাদ সা.-কে রক্ষা করতে চুক্তি করেছিল কিন্তু যুদ্ধে জড়িত হওয়ার চুক্তি করেননি। এ অবস্থায় একজন ইয়াং মদিনার সাহাবী একত্বতা ঘোষণা করলেন। এরপর পুরো টিম মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন।

যুদ্ধের সাধারন নিয়ম অনুযায়ী মুসলিমদের কোনভাবে জেতার সম্ভাবনা ছিল না। তিনি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধের আগের রাতে না ঘুমিয়ে শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন। এতই বেশি বিচলিত হয়ে যান যে দুই হাত আকাশে উঠিয়ে ভিখারীর মত pleading করতে করতে হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর শরীরের চাদর পড়ে যায়। উনার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আবু বক্কর রা. জড়িয়ে ধরে শান্ত করা চেষ্টা করে বলেন- আল্লাহ অবশ্যই জয়ী করবেন। হযরত মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর কাছে প্লিডিং করে বলছিলেন – মুসলিমরা হেরে গেলে পৃথিবী থেকে ইসলাম বিলীন হয়ে যাবে, ইবাদত করার কেউ বাকী থাকবে না। এখানে আশা এবং ভয়ের শিক্ষা আমাদের জন্য রেখে গেছেন।

অবশেষে যুদ্ধের সময় অনেক মিরাকল ঘটে। মুসলিমরা জিতে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যে। আল্লাহর প্রমিজ অনুযায়ী ১০০০ জন এঞ্জেল নিয়োগ করেছিলেন। একজন এঞ্জেল-ই যথেষ্ট ছিল। সাহাবীরা যুদ্ধের মাঠে এফোর্ট দিয়েছেন কিন্তু কার্য সমাধান করেন ফেরেস্তারা। কুরআনের এই বিষয়ে আলোচনা এসেছে। প্রফেট (সা) এক মুঠো ধুলো নিক্ষেপ করেন তা অনেক দূরে অবস্থিত শত্রুপক্ষের সবার চোখ ঝাপসা করেছিল। এ বিষয়ে কুরআনের একটি আয়াতও রয়েছে। অবশেষে মুসলিমরা জয়ী হলো। ইসলামের শুরুর দিকে যারা চরম শত্রুতা করেছিলে তাদের (আবু লাহাব ছাড়া) সবাই মারা যান। স্ট্র্যাটেজিক কারনে যুদ্ধের পরও ৩ দিন অপেক্ষা করতেছিলেন যদি বিরোধী পক্ষ ফিরে আসে।

 হযরত মুহাম্মাদ সা. বদর যুদ্ধ থেকে যখন মদিনায় ফিরলেন তখন জানলেন যে তাঁর প্রিয় মেয়ে ইন্তেকাল করেছেন। মদিনায় ফিরে প্রথমে মেয়ের কবরস্থানে যান। যেখানে বিজয় উতযাবন করার কথা ছিল সেখানে আল্লাহ এই ঘটনা ঘটালেন। আল্লাহ চাইলে তো কিছুদিন পরেও এই মৃত্যু দান করতে পারতেন। মুসলিমদের শিক্ষা দেয়ার জন্যও হয়ত এমন অবস্থার অবতারনা করেন যে দিনশেষে আমাদের কবরেই যেতে হবে, আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।

লেখক : বিশিষ্ট শিক্ষক, গবেষক এবং কলাম লেখক