নব-জাগরণের সেনাপতি মুহতারাম শফিক ভাই!

মনজুরে মাওলা ||

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ। দেশের চারিদিকে ভয়াবহ অভাবের সাথে আরেকটি দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয় সমাজ। সারা বাংলার যুব ও ছাত্রসমাজ আঁধারে ডুবতে থাকে ক্রমশ। তরুনেরা রুশ-বলশেভিক লাল মশালের চারপাশে জড়ো হতে থাকে আগুনের শিখায় ঝাপ দেয়া পোকার মত। পাক হানাদার থেকে ভিটেমাটি উদ্ধার করতে না করতেই যুব সমাজের মস্তিস্ক লুট করে নেয় রুশ হানাদারেরা। নতুন এক সংকটে পড়ে দেশ। বন্যার ঢলের মত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে এ আগ্রাসন। এমনকি দেশ স্বাধীনকারী দল ছাত্রলীগ, আওয়ামীলীগও বেশামাল এ বন্যার উম্মাতাল ঘুর্ণিতে তলিয়ে যেতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যে একেবারে চোখের সামনেই উলট-পালট হয়ে যায় সব। পথ হারিয়ে ফেলে দেশের রাজনীতি। স্বাধীনতার স্থপতিকে খুন করা হয়। ছাত্র ইউনিয়ন ও রুশ কমিউনিস্টদের অক্টোপাশে আপাদমস্তক আটকে পড়ে গোটা দেশ। লেলিন-কার্লমাক্সের চোখ ধাধানো রঙ্গিন শ্লোগানে যুব সমাজ প্রতিদিন শামিল হতে থাকে কাতারে কাতার। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্যাম্পাস সবকিছু হয়ে যায় ছাত্রইউনিয়নের। তিরমীয, বুখারাসহ রাশিয়ার মসজিদসমুহকে বানিয়ে ফেলা হয় ঘোড়ার আস্তাবল। সেই দীক্ষায় দীক্ষিত এদেশের কমিউনিস্টরাও ধর্মকে আফিম ঘোষণা করে বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর ঘোষণাও তারা দিয়ে বসে। নিয়ন্ত্রণহীন ও বেশামাল এ বন্যা রুখার যেন কেউ নেই। ঠিক এ সময় ঘুরে দাঁড়ান কিছু যুবক। বের হয়ে আসেন কয়েকজন লড়াকু বীর। তীব্র আত্মশক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন তারা বাঁধ না মানা সেই কঠিন স্রোতের বিপরীতে।

মাওলানা শফিক উদ্দীন ভাই ছিলেন সেই বিপ্লবীদের একজন। ১৯৮০ সালের সেই উত্তপ্ত সময়ে সিলেট অঞ্চলে বিভ্রান্ত যুব সমাজকে বাঁচাতে নিরাপত্তা ব্যুহ রচনা করেন তিনি। এ সময় তিনি সিলেট শহর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। শুরু হয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃত ক্যাম্পাসে তাঁর লাগাতার প্রোগ্রাম ও সফর। মিছিল, সমাবেশ, সেমিনারে তুখোড় বক্তৃতা করতে থাকেন। চলে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা। ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করে যুগের চাকা। খুলতে থাকে তারুন্যের মাথায় কম্যুনিজমের পাকানো জট। ছাত্র ইউনিয়নের ধুলিপড়ায় অন্ধ হওয়া চোখ খুলতে শুরু করে ছাত্রদের। শুরু হয় ইসলাম বনাম সমাজতন্ত্রের আদর্শিক লড়াই। আর তখনই ব্যারিকেডে পড়ে এ দেশে কমিউনিজমের দুর্বার গতি। আল্লাহর অপার রহমতে কিছুদিন পর নবৃবইয়ের দশকে জন্মস্থান খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেই কমিউনিজমের মৃত্যু ঘটে। রাশিয়া খান খান হয়ে কয়েেকটি মুসলিম রাষ্টের অভ্যুদয় ঘটে। এ দেশে বামরা রাজপথে টিকতে না পেরে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি সাংবাদিকতায় বাসা বাধেঁ। যেখান থেকে আজো বুনে তারা দ্বীন ও দেশবিরোধী চক্রান্ত।

জনাব শফিক ভাই ১৯৮০ সালে সিলেট আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করেন। এরপর আসে পরিবারের জন্য তাঁর আয়-রোজগারের পালা। কিন্তু না, পেছন থেকে আবার আসে সময়ের ডাক। প্রয়োজন পড়ে শিক্ষাঙ্গনের সবুজ ক্যাম্পাসে দ্বীনের দাওয়াতকে অারো সামনে নেয়ার। তাই চাকুরী-রোজগারের ফিকির ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। ১৯৮১ তে সিলেট এমসি কলেজেের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ১ম বর্ষে ভর্তি হন শফিক ভাই। তখন বেগবান হয়ে উঠে এমসি ক্যাম্পাসে ইসলামের জয়গান। ১৯৮৩ তে অনার্স ফাইন্যালে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৪-৮৫ সেশনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স (এমএসএস) সম্পন্ন করেন শফিক উদ্দীন ভাই। ক্যাম্পাস থেকে ক্যাম্পাসে এভাবেই কেটে যায় তাঁর দীপ্ত যৌবনের একটির পর একটি বছর। সময় বয়ে যায় আল্লাহর পথে। ছাত্ররা আলোকিত হয় ইসলামের শ্বাশ্বত সৌন্দর্য্যে।

১৯৮০ সালে ছাত্র ইসলামী আন্দোলনে সিলেট জেলা সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন শফিক ভাই। ১৯৮১ সালে তাঁর উপর অর্পিত হয় সিলেট শহর সভাপতির দায়িত্ব। আন্দোলনের নতুন বাঁকে ১৯৮২ ও ৮৩ সালেও তিনি সিলেট শহর শাখার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সিলেটের দাওয়াত ও সংগ্রামে তেজ বাড়ে তাঁর সাথী আরেক তেজস্বী বীর জনাব আবদুল কাদির সালেহ ভাইয়ের দীপ্ত পদভারে। এরপর শফিক ভাই স্থানান্তরিত হন কেন্দ্রে। ১৯৮৪ সালে তিনি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে আসে তাঁর উপর সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্ব। এ সময় তাঁর কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন হাফেজ সুলতান আহমদ ভাই। তখন এরশাদ শাসনামলে তিনি, সালেহ ভাই ও ইসমাঈল জবীহুল্লাহ ভাই একই সাথে কারাগারে বন্দী হন। কারামুক্তির পর ১৯৮৮ সালে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব আসে শফিক ভাইয়ের কাঁধে। এরপর থেকে ৮৯ পেরিয়ে একটানা ১৯৯০ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সভাপতির ভারি দায়িত্ব বহন করেন।

তিনি আন্দোলনকে নতুন মাইল স্টোনে পৌছে দেন। দেশে ঘটে নতুন সোনালী এক সুর্যোদয়। একদিন ঘুম থেকে উঠে এ দেশের ছাত্র সমাজ শুনে ইসলামী ছাত্র মজলিসের মিষ্টি নাম। তার কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব আব্দুল কাদির সালেহ ভাইয়ের মাথায় দিয়ে নব্বইয়ে ছাত্রত্ব শেষ করেন তিনি। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারী, মহানগরী সভাপতি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, নায়েবে আমীর, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিবসহ বহু দ্বীনি জিম্মাদারী পালন করে যান তিনি।

শ্রদ্ধেয় শফিক ভাইকে নিয়ে আছে আমার অজস্র স্মৃতি। সিলেটে কাজ করার সময় আছে বিভিন্ন কর্মশালায় বহুবার তাঁর আলোচনার ডায়েরী। এরপর আছে চট্টগ্রামে ও ঢাকা মহানগরীতে কত মিষ্টি মধুর স্মৃতি। ১৯৯৯-২০০০ সালে আমি যখন ছাত্র মজলিস ঢাকা মহানগরীর দায়িত্বে। একই সময়ে তিনিও তখন খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগরীর সভাপতির দায়িত্বে। তখন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। ঠিক আজকের মতই প্রতিদিন ছিল রাজপথের কর্মসূচী। মিছিল, সমাবেশ, হরতাল, গ্রেফতার, টিয়ারসেল চলছেই। আরো ছিল পল্টন টু নাজিম উদ্দিন রোডের নিয়মিত যাতায়াত। এ সপ্তাহে কয়জন বের হলেন, তো পরের সপ্তাহে নিয়ে গেলো আরো কয়েকজন। আমরা সকালে বের হতাম বিকেলে বাসায় ফিরে আসা না আসা উভয় সম্ভাবনা নিয়ে। শায়খুল হাদীস থেকে নিয়ে মহানগরীর কয়েকশত কর্মী তখন কারাগারে। ঐ সময় পল্টন মোড়, বিজয়নগর, কাকরাইল মোড় ও নয়াপল্টন ছিল আমাদের প্রতিদিনকার সকাল-বিকালের ঠিকানা। একটানা প্রায় এক বছর তখন রাজপথে কাটাতে গিয়ে দিনের বেলা কড়া ধমক আর রাতের বেলা কত যে মিষ্টি থ্যাংকস পেয়েছি শফিক ভাইয়ের, তার সঠিক হিসাব আজ আর মনে নেই।

শফিক ভাই ছিলেন গাম্ভীর্য স্বভাবের ও স্বল্পভাষী। হয়তো বয়সের কারণেওঅনেকটা। আমরা তাঁর সামনে গেলে ভয়েই থাকতাম কিছুটা। অবশ্য মুচকি হেসে কথা শুরু করলে ভয় কেটে যেত মুহুর্তেই। নোয়াখালীসহ ঢাকার বাইরে তাঁর সাথে একসাথে সফর হয়েছে আমার। সফর সাথী হিসেবে ছিলেন তিনি দারুণ মজার। ছাতকের দীগলবাক থেকে বের হয়ে দেশকে তিনি জাগিয়ে দিলেন। সেই স্মৃতিজড়ানো মাতৃভুমিতে আজ এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলেন! হে আল্লাহ! শফিক ভাইকে তাঁর মা-বাবা, তাঁর গড়া প্রিয় সাথী আ.খ.ম হায়দার আলী ও শেখ গোলাম আসগর ভাইয়ের সাথে জান্নাতের কোন একটি জায়গায় একত্র করে দাও।

গোবিন্দগঞ্জের মাঠে আজ আসরের পর অনুষ্ঠিত হয় শফিক ভাইয়ের শেষ জানাযা। আহা! মাত্র এক ঘন্টার ব্যবধানে আড়াল হবেন তিনি তাঁর কর্মমুখর জগত থেকে। সবাই যখন কথা বলছে শফিক ভাইকে সামনে নিয়ে। আমার দু চোখ সিক্ত হয় হাজার দিনের স্মৃতিতে….।