মহান মে দিবস ও ইসলামে শ্রমিক নীতিমালা

মুফতি ওসমান আল-হুমাম উখিয়াভী ||

প্রতিবছর পালিত হয় মে দিবস। শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের কাছে এ দিনটি যেমন আনন্দ ও বেদনার, তেমনি প্রেরণা ও আবেগের। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা শ্রমের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে আত্মদান করেছিলেন, তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৮৯০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এখন দুনিয়ার প্রতিটি দেশে মে মাসের ১ তারিখ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গুরুত্বসহকারে পালন করে আসছে শ্রমিক দিবস। মে দিবস এলে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে ঘর্মাক্ত মেহনতি মানুষের প্রতিচ্ছবি। শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নটিও উঠে আসে সবার সামনে।

১৮৮৬ সালের ৪ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিক বিক্ষোভ ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ১৮৮৯ সালে প্যারিসের সোশালিস্ট পার্টি ১ মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমদিবস’ (International Worker’s Day) হিসেবে ঘোষণা করে। ক্রমান্বয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিবসকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ দিনকে মে-দিবস’ও বলা হয়। মে দিবসকে সামনে রেখে এ লেখায় আমরা ইসলামের শ্রমনীতি ও মালিক-শ্রমিক সম্পর্ককে অতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে চাই।

আজকের শ্রমিক শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিপতিদের হাতে চরমভাবে নিস্পেষিত হচ্ছে। আবার কোথাও লাল সম্রাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রীদের হাতে। পত্রপত্রিকায় খোঁজ খবর নিলে দেখা যায় শ্রমিকের সাধ্যের বাইরেও আজ অনেক কাজ তাকে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে একজন শ্রমিক দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতে হচ্ছে; সরকারি ছুটির দিনেও নেই তার বিশ্রাম। তাকে যে পরিমাণ খাটান হয় সে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। বরং তার উপর নিয়মিত জুলুমই করা হয়ে থাকে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার পৃথিবীর কেউ দিতে পারেনি, পারবেও না। কারণ মানুষের চিন্তাপ্রসূত আইন দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। শ্রমিকদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করেছে একমাত্র ইসলাম। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে শ্রমজীবীদের সকল সমস্যার সার্বিক ও ন্যায়ানুগ সমাধানের দিকনির্দেশ করেছে। শ্রমিকদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে-“আমি তোমার উপর কোনরূপ কঠোরতা করতে চাই না, কোন কঠিন দুঃসাধ্য কাজ তোমার উপর চাপাতেও চাই না, আল্লাহ চাহে তো তুমি আমাকে সদাচারী হিসেবেই দেখতে পাবে। [সূরা কাছাছ-২৭] কুরআন মাজিদ আরো বলছে- ‘এবং তোমরা যা কিছু করতেছিলে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবো। [সূরা নাহল-৯৩] সূরা নিসার ১০৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “যে লোক বিশ্বাস ভঙ্গ করে অর্পিত কাজ বা জিনিস বিনষ্ট করে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন না। উক্ত আয়াতগুলোতে শ্রমিক মালিক উভয়ের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে এবং কেউ এর ব্যতিক্রম করলে তাকে যে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে সে দিকেও ইংগিত করা হয়েছে।

ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা : নিজে পরিশ্রম করে যে স্বাবলম্বীতার পরিচয় দেয়, এমন শ্রমিক ও শ্রমজীবী আল্লাহর প্রিয়, তাঁর নবীজীর (স.) প্রিয়পাত্র। বায়হাকী শরীফে বলা হযে়ছে, “শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু।” (বায়হাকী)। আল্লাহ নিজে এদের প্রশংসা করে বলেছেন, “এমন বহু লোক আছে যারা জমিনের দিকে দিকে ভ্রমণ করে আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) খুঁজে বেড়ায়।” (সূরা মুয্যাম্মিল :২০)। সূরা জুমুয়ায় নির্দেশনা রযে়ছে, “সালাত আদায় হযে় গেলে জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) খুঁজে বেড়াবে।” (৬২:১০)। রাসূলুল্লাহ (স.) এই খোঁজাখুঁজিকে সরাসরি জিহাদতুল্য ইবাদাত বলে আখ্যাযি়ত করেছেন “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(স.)-এর কাছে দিযে় গমন করে। সাহাবীগণ লোকটির শক্তি, স্বাস্থ্য ও উদ্দীপনা দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) থাকত! তখন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যদি লোকটি তার ছোটছোট সন্তানদের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিযে় থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই (ফী সাবীলিল্লাহ) রযে়ছে। যদি সে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিযে় থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রযে়ছে। যদি সে নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিযে় থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে।” (আত-তারগীব ২/৩৩৫)

শ্রমিকের অধিকার : শ্রমিকের অধিকারকে আমরা মালিকের কর্তব্য ও দাযি়ত্ব বলে ব্যক্ত করতে পারি। মালিক এই দাযি়ত্বপালন করে না বলেই পোশাক-শিল্পে অহরহ শ্রমিক-বিক্ষোভ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। ইসলাম মালিককে এ ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিযে়ছে। নিযে়াগের আগেই শ্রমিকের মজুরী নির্ধারণ করতে হবে, যাতে শ্রমিক না ঠকে এবং মালিককে ঝামেলার মুখোমুখি হতে না হয়। হাদীসের ভাষায় “মজুরের মজুরি নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিযুক্ত করবে না।” (বায়হাকী) আল-কুরআনে মজুরি নির্ধারণের এই আদর্শ দেখতে পাই, হযরত শোয়ায়ব (আ.) কর্তৃক হযরত মূসা (আ.)-কে পারিশ্রমিক নির্ধারণের মধ্যে। (সূরা কাসাস ২৮:২৭)

বর্তমান দুনিয়ায় শ্রমিকদেরকে ঠকানোর বড়ই প্রতিযোগিতা চলছে। যার কারণে যখন তখন শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। শ্রমিকরা তাদের পাওনা আদায়ে রাজ পথে নামতেও অনেক সময় বাধ্য হয়। এতে এক শ্রেণীর উশৃঙ্খল লোক গাড়ি-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেশের অনেক মূল্যবান সম্পদও নির্বিচারে ধ্বংস করে থাকে। যা ইসলাম সমর্থন করে না। যারা শ্রমিকের মুজুরি যথার্থভাবে আদায় করবে না কিয়ামাতে তাদের সাথে আল্লাহ তা‘আলার ঝগড়া হবে। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, কিয়ামাতের দিন তিন ব্যক্তির সাথে আমার ঝগড়া হবে- ১. ঐ ব্যক্তি, যে আমার নামে কোন চুক্তি করে তা ভঙ্গ করেছে ২. সেই ব্যক্তি, যে কোন মুক্ত মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে আর ৩. সেই ব্যক্তি, যে মজুরের দ্বারা কাজ পুরোপুরি করিয়ে নিয়েছে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি। [সহীহ বুখারী]

লেখক : প্রবন্ধিক, বহু গ্রন্থ প্রণেতা