রাতের মেঘশূন্য আকাশ দেখা

মাওলানা আমজাদ হোসাইন ||

আমার অনেকগুলো অভ্যাসের একটি হলো রাতের মেঘশূন্য আকাশ দেখা; যখন তারাদের মেলা বসে৷ আচ্ছা আপনি শেষ কবে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখেছেন মনে আছে! একসপ্তাহ, একমাস, একবছর নাকি আরও আগে…?

যাইহোক, জীবনে কখনোও না কখনো তো তারা দেখেছেন৷ ঐ দূর আকাশে আমরা যাদের মিটমিট আলোয় জ্বলতে দেখি, সেই মূহুর্তের সেই আলোটাও যে কত শত বছর আগে ওখান থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছিলো তা হিসেব করার বিষয়৷ একটি-দুটি নয় এমন শতসহস্র তারা-নক্ষত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই মহাবিশ্বের আকাশে। এদের একেকটার আকার আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহের চেয়েও অনেক বড়।

আচ্ছা, কোন তারায় গিয়ে যদি পৃথিবীর দিকে তাকানো হয়; তাহলে পৃথিবীটাকে কেমন দেখা যাবে? নিশ্চই আমাদের দেখা ঐ বিন্দু বিন্দু তারাগুলোর চেয়ে বড় নয়! অথচ এই বিন্দুতেই আমাদের সব আয়োজন। এই বিন্দুটুকুর আরোও ক্ষুদ্র বিন্দু বা অংশ নিয়ে হাজার হাজার সৈনিক যুদ্ধ করে প্রাণ দিচ্ছে৷ এই ক্ষুদ্র বিন্দুর কোন এক ক্ষুদ্র অংশ শাসন করেই শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় শক্তিশালী মনে করছে। নিজেদের ভাষ্কর্য উদ্বোধন করে, অফিসে অফিসে ছবি ঝুলিয়ে; তারা মনে করে তাদের এই শক্তি-সামর্থ রয়ে যাবে চিরকাল!

মহাবিশ্বের এইটুকু বিন্দুতেই রয়েছে শত-সহস্র ধর্ম-মত, যারা সবাই নিজেকে সঠিক মনে করে। এটুকু বিন্দুতেই রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর লক্ষ লক্ষ কবিতা, গল্প আর গান৷ গভীর জীবনবোধ নিয়ে লেখা শতশত কবি আর ঔপন্যাসিক এসে চলেও গেছে আসল গন্তব্যে। এটুকুর মাঝেই রয়েছে কতো ভালোবাসা, কতো টান আর আবেগ! বয়ে গেছে কতো অশ্রুশ্রোত, কেটে গেছে কতো হাসিখুশির মুহূর্ত৷ এটুকুতেই রয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ, কারো অর্জনে অপরের জ্বালা ধরা মন্তব্য নির্নিমেষ। এটুকু জায়গায় কতো মানুষের কতো মত, কতো অহমিকা-অহংকার, কতো ঘৃণা আর ক্রোধের প্রজ্বলন।

মানুষ মরে মাটির সাথে মিশে নিঃশেষ হয়ে যায়, তবুও শেষ হয় না তার প্রতিশোধ নেয়া৷ এদিকে জীবিতদের মুখে অন্ন নেই, অথচ মৃতদের জন্য আয়োজনের শেষ নেই৷ অপরাধীরা ফুলের মালা গলায় ঘুরেফিরে, আর মানব হিতৈষীরা ডুকরে মরে কারাগারে৷ কী মনে হয়, এতো কিছু দেখার পরও পৃথিবীর মতো লক্ষ-কোটি ক্ষুদ্রাংশের সৃষ্টিকর্তা চুপ কেন? ঐ যে, তারা যেন বলতে না পারে, আমাদেরকে তো শুধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি!

অগণিত গ্যালাক্সি আর অসংখ্য সৌরজগতের একটিতে আমাদের এই ক্ষুদ্র পৃথিবী৷ অথচ এই সুবিশাল আয়োজন মাঝে ক্ষুদ্র এই বিন্দুতে; ক্রোধান্ধ আর আমিত্বকে জয় করার নিরুদ্দেশ যাত্রাপথে আমাদের কি নিজেদের ক্ষুদ্রতা আদৌ অনুভব হয়?

লেখক : শিক্ষক, দারুল আজহার মডেল মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা