রাষ্ট্রীয় বাজেটে কওমী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ভাবনা

সৈয়দ শামছুল হুদা ||

দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো নিয়ে দেশের উচ্চমহলে এক ধরণের নেতিবাচক মানসিকতা দেখতে পাওয়া যায়। কিছু মানুষ এমন আছে, যারা কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও যে মানুষ এটা মনেই করতে চায় না। সাবেক বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে যখন কওমী মাদ্রাসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন এমন একটি উত্তর দিয়েছিলেন যেন তিনি কোনদিন কওমী মাদ্রাসার নামই শুনেননি। বিষয়টি চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ের। স্বীকৃতি নিয়ে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. জোট সরকারের অংশীদার হয়েও যখন মুক্তাঙ্গনে অবস্থান কর্মসূচীতে গেলেন তখন মিডিয়ায় বিষয়টি হৈচৈ পড়ে গেলো। তখনই এটা বুঝেছিলাম যে, আসলে রাষ্ট্রের ওপর মহলে যারা বাস করে তারা দেশের আলেম-উলামাদের কী দৃষ্টিতে দেখে। আজো সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। কিছু কৌশলগত পরিবর্তন ছাড়া।

যেটা বলতেছিলাম তাহলো, সেই সময় থেকে এখনো পর্যন্ত দেশের সুশীল সমাজ এবং সরকারের অনেক উঁচুমহলে কওমী মাদ্রাসা নিয়ে এক ধরণের উন্নাসিকতা কাজ করে। তারা সুযোগ পেলেই এক ধরণের তাচ্ছিল্য, অবহেলা, অবজ্ঞার দৃষ্টিতে কওমী আলেমদের দেখেন। কেহই কওমী আলেমদের কোন প্রকার স্থায়ী সুযোগ দিতে রাজি হয় না। সবাই পিঠ বুলিয়ে দিতে চায়। বাহবা নিতে চায়। এখনো পর্যন্ত বাস্তবে কোন উন্নতি হয়নি। স্বাধীনতার ৫০বছর পর মাত্র এতটুকু অর্জন হয়েছে যে, কওমী মাদ্রাসাও মাদ্রাসা। এই বাইরে আর কিছুই অর্জন হয়নি।

বর্তমান সরকারের আমলে কওমী মাদ্রাসাগুলোর কিছু প্রসার ঘটেছে বটে, সনদের স্বীকৃতিও মিলেছে, বিনিময়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার, আন্দোলন করার, সংগ্রাম করার অনেক অধিকারই তারা হারিয়েছে। আর এখনতো পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, এ নিয়ে আলোচনা করাও রীতিমতো অপরাধের মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টা কি অস্বীকার করা যাবে যে, দেশের কওমী মাদ্রাসায় লেখাপড়া করা সন্তানরাও এদেশের মানুষ। তারা এদেশেরেই সন্তান। তাদের বাপ-চাচারাও সরকারকে ট্যাক্স দেয়। তাদের ট্যাক্সের টাকায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এবছরও আলিয়া মাদ্রাসার জন্য ৯হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দেশের কওমী মাদ্রাসা গুলোর জন্য, এ ধারার লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য সরকারী কোন বরাদ্ধ নেই। বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের পর কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ পরিষদের সনদের মান ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই মান দ্বারা কী কাজ করা যাবে তার কোন উত্তর রাষ্ট্রের কাছে নেই।

গত পরশুদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া বাংলাদেশ এর নবনিযুক্ত প্রকাশনা বিভাগীয় বিশেষ দায়িত্বশীল এবং বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য বেফাক অফিসে গিয়েছিলাম। উনার কাছে সুনির্দিষ্টভাবে ৪টি আবেদন তুলে ধরেছি, যাতে উনার মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করেন। বিষয়গুলো হলো নিম্নরূপ :

ক. সরকার যে, আমাদের হাইয়ার সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছে এই স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের ছেলেরা কোথায় কী কাজে লাগাতে পারবে তার একটি ব্যাখ্যা সরকারের নিকট থেকে নেওয়ার জন্য।

খ. কওমী মাদ্রাসাগুলো নিজেরা কষ্ট করে দেশে লাখ লাখ আলেম তৈরি করেছে। রাষ্ট্র এদের থেকে বাছাই করে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করলে দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। এ বিষয়টি কীভাবে সরকারের সাথে আলোচনা করে বাস্তবায়ন করা যায়, তার জন্য বিশেষভাবে হাইয়ার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আবেদন রেখেছি।

গ. সারাদেশে মাদ্রাসাগুলোর নামের মধ্যে এক ধরণের অরাজকতা বিরাজ করছে। মক্তব, এতিমখানার নামের মধ্যেও “জামিয়া” (বিশ্ববিদ্যালয়) শব্দটি ব্যবহার করে বিদেশিদের কাছে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সারাদেশে একই সিলেবাস, একই শ্রেণিবিন্যাস ও কমপক্ষে দাওরায়ে হাদীস খোলার আগে কোন মাদ্রাসার নামের সাথে জামিয়া ( বিশ্ববিদ্যালয়) শব্দটি ব্যবহার না করার ব্যাপারে হাইয়ার অধীনস্থ ৬টি বোর্ড থেকে একটি নির্দেশনা আশা করছি।

ঘ. বেফাক প্রকাশনীর মাধ্যমে বেফাক এর কোটি কোটি টাকা আয়ের পথ রয়েছে। অতীতে এটা নিয়ে নানা কথা ছড়ালেও যেহেতু এবার আর সেই সুযোগ নেই, তাই বেফাক সিলেবাসটাকে কীভাবে মানসম্পন্ন করা যায়, তার বিশেষভাবে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আবেদন রেখেছি। প্রস্তাব করেছি, বেফাকের পক্ষ থেকে একটি উচ্চতর সম্পাদনা বোর্ড গঠন করে, প্রতি ৩বছর অন্তর অন্তর সকল কিতাবাদির ব্যাপারে বিশেষভাবে পুনর্বিবেচনার জন্য উদ্যোগ গ্রহন করা যায় কী না?

আরো একটি বিষয় বলেছি, সাবেক সফল মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার মরহুম কত বছর আগে বেফাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত স্বতন্ত্র বাংলা, অংক, ইংরেজি, ভূগোল চালু করেছিলেন, সেটাকে আমরা এত বছর পরও শরহে বেকায়া স্তর পর্যন্ত উন্নীত করতে পারলাম না। আজকে যদি শরহে বেকায়া পর্যন্ত নিজস্ব বাংলা, ইংরেজি, অংক, সমাজ বিজ্ঞান, সমাজকর্ম সিলেবাস ভুক্ত করা যেতো, তাহলে কওমী শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার হতো। প্রস্তাবগুলো মুহতারাম রাজু ভাই গুরুত্ব সহকারে শুনেছেন। আশাকরি যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর এ আবেদনগুলো সময়মতো পৌঁছাবেন। এগুলো বলার অন্যতম কারণ হলো, কওমী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান এর পথ পরিস্কার করা।

সম্প্রতি সিভিল এভিয়শেনে বড় ধরণের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। সেখানে ইমাম ও মুয়াজ্জিন পদে লোক নিয়োগের কথাও আছে। অথচ যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে শুধুমাত্র দাখিল ও আলিম। হাইয়াতুল উলয়া থেকে দাওরায়ে হাদীস সনদ নিয়ে মুয়াজ্জিন পদে ঢোকারও সুযোগ নেই। অথচ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামীলীগের নেতানেত্রীগণ বারবার বলেন, তারা কওমী মাদ্রাসার জন্য বিরাট কিছু করেছেন। সারা বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসার সনদ দিয়ে সরকারী কর্মস্থলে মুয়াজ্জিন পদে ঢোকারও সুযোগ নেই। তাহলে কওমী মাদ্রাসার জন্য কী উপকার করলেন উনারা?

আমাদের দাবী এই যে, যেহেতু সরকার হাইয়াতুল উলয়ার দাওরায়ে হাদীসকে জেনারেল ধারার ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে এমএ সমমান দিয়েছে, সেহেতু উক্ত সনদ দিয়ে যে সকল সুযোগ সুবিধা শিক্ষার্থীদের দেয়, একই সুযোগ-সুবিধা কওমী শিক্ষাথীদের দেওয়া হোক। একটি বিষয় গ্যারান্টি সহকারে বলতে পারি যে, জেনারেল ধারা থেকে যারা এরাবিকে ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে এমএ করে যে যোগ্যতা তারা অর্জন করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কওমী ছাত্ররা আরো অনেক বেশি যোগ্যতা অর্জন করে। কওমী শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োগ দিয়ে তাদের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ দেওয়া হোক।

কওমী শিক্ষার্থীদের জন্য বাজেটেও কোন বরাদ্দ নেই। সরকারের কোন ধর্মীয় অঙ্গনে চাকুরীর আবেদন করারও সুযোগ নেই, তাহলে কওমী মাদ্রাসাগুলোর জন্য সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের এত দরদ দেখিয়ে লাভ কি? কওমী শিক্ষাথীদের কর্মসংস্থান দিন। তারা আপনাদের কথা স্মরণ রাখবে। নতুবা ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের কতদিন দমিয়ে রাখা যাবে?