করোনায় উপলব্ধি হলো বিষয় হিসেবে সাইকোলজির গুরুত্ব

এইচ এম তৌফিকুর রহমান ||


একজন মানুষ কি আচরণ করে, কেন করে, বর্তমান আচরণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা প্রদান এবং সেই আচরণ যদি ব্যক্তির নিজের অথবা অন্য কারো জন্য ক্ষতিকর হয় তাহলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করাই মূলত সাইকোলজির কাজ। যার প্রয়োজনীয়তা আমরা করোনা পরিস্থিতিতে উপলব্ধি করতে পেরেছি প্রবলভাবে। আমাদের জীবনে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তার ভালো এবং মন্দ দুটি দিকই থাকে। করোনার ক্ষেত্রেও কথাটি সত্যি। করোনা যেমন আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার করোনা কারনেই আগের চেয়ে বহুগুণ স্বাস্থ্যসচেতনতা থেকে শুরু করে নানাবিধ ভালো জিনিস উপহার দিয়েছে।

একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে আমাদের সমাজে। তাহলো : ‘কারো পৌষমাস,কারো সর্বনাশ’ ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতিতে। সারা পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার লোক যেমন চাকরি হারিয়েছেন, তেমনি কিছু লোক এই করোনা আসার ফলেই কামিয়ে ফেলেছেন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। গেমিং অ্যাপস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, জুমের মত ভিডিও কনফারেন্সিং অ্যাপস অথবা ই-বিজনেসের ভরা পৌষমাস ছিল এই করোনা।

একি ঘটনা ঘটেছে সাবজেক্ট ভ্যালু এবং রিসার্চ ফান্ডিংগুলোর ব্যাপারে। হেলথ রিলেটেড সাবজেক্টগুলো এবং এগুলোগে ফান্ডিং উঠে এসেছে সবার উপরে। করোনাকালে বহুল আলোচিত দুইটি জিনিস ছিল। এক নাম্বারে করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার, আর অন্যটি হল এমন একটি ভয়াল দানবের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা। কারণ, যখন মানুষের করোনার বিরুদ্ধে অনেকটা নিরুপায় হয়ে পড়েছিল তাখন আল্টিমেটলি মানসিক শক্তি ধরে রাখার কোন বিকল্প ছিলনা। উন্নত দেশগুলোতে ইতোপূর্বে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা হলেও, বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ একটি সোশ্যাল ট্যাবু ছিল। কিন্তু করোনার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়েছে, যেখানে উন্নত, অনুন্নত সব দেশের জনগণই এটাকে খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।আর এটাই হল সাইকোলজি ফিল্ডের জন্য পৌষমাস।

করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে যেমন বিভিন্ন দাতা সংস্থা এগিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনি সরকার থেকে শুরু করে বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকেও মেন্টাল হেলথ ভালো রাখার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডিং করা হচ্ছে।আর তাই সারা পৃথিবী জুড়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে সাইকোলজিস্টদের চাহিদা। কারণ সবাইকে এই করোনা বুঝতে বাধ্য করেছে যে, পাবলিক হেলথ ভালো রাখা ফিজিক্যাল হেলথ ও মেন্টাল হেলথ দুইটার সমন্বয় ছাড়া সম্ভব নয়। তাই যারা ভবিষ্যতে এমন একটি ফিল্ডে আসতে চান যেটার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সামাজিক চাহিদা অনেক বেশী,তাহলে তাদের জানা উচিত কিভাবে একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়।

প্রথমেই আমরা জানবো মনোবিজ্ঞানী হতে হলে কিভাবে পড়াশোনা করতে হবে : কোন ছাত্র/ছাত্রী যদি মনোবিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাহলে প্রথমেই তাকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হতে হবে। এক্ষেত্রে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হতে হলে কোন বিভাগে পড়া উচিত? এর উত্তর হচ্ছে যদিও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সুবিধা একটু বেশি থাকে তারপরেও মানবিক কিংবা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকেও সাইকোলজিতে পড়াশোনা করা যায়।যেখানে নির্দিষ্ট অনুপাতে তিন বিভাগ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশে কোথায় কোথায় সাইকোলজি পড়ানো হয় : বাংলাদেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালযয়ে বর্তমানে সাইকোলজি বিষয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট এবং গ্রাজুয়েট লেভেলে পড়াশোনা চালু রয়েছে। তাদের মধ্যে-  ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ৪. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৫. বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এছাড়াও ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সাইকোলজি বিষয়ে পড়াশোনা করা যায়।

একজন সাইকোলজিস্ট হতে কি কি যোগ্যতা লাগে : একজন সাইকোলজিস্ট হতে মূলত সাইকোলজি তে অনার্স, মাস্টার্স এবং ক্লিনিক্যাল প্রাক্টিস এর জন্য এম,ফিল করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু অন্যান্য প্র্যাকটিসের জন্য যেমন,কাউন্সেলিং এর জন্য সেই কাউন্সেলিং সাইকলজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স করলেই যেকোনো ব্যক্তি প্র্যাকটিস করতে পারবেন। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ মাস্টার্স পর্যায়ে ক্লিনিক্যাল, কাউন্সেলিং এবং স্কুল সাইকোলজি বিভাগে ডিগ্রী প্রদান করা হয়ে থাকে।

একজন সাইকোলজিস্টের ব্যক্তিগত যোগ্যতা : সাইকোলজি যেহেতু একটি প্রাক্টিক্যাল ফিল্ড,তাই একজন সাইকোলজিস্টের শুধুমাত্র একাডেমিক নলেজ থাকবে অথবা তার অনেকগুলো সার্টিফিকেট থাকবে বিষয়টি এমন নয়।এগুলোর পাশাপাশি একজন ব্যক্তি হিসেবে একজন সাইকোলজিস্ট এর আরো বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী হতে হবে। তবেই তিনি অন্য একজন ক্লায়েন্টের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। ব্যক্তিগত যোগ্যতা গুলোর মধ্যে রয়েছে, ধৈর্য, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার ক্ষমতা, পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা, ভালো সম্পর্ক তৈরি করা। এছাড়াও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মত গুণসহ আরো অনেকগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুন একজন সাইকোলজিস্ট এর মধ্যে থাকতে হবে।

সাইকোলজিস্টদের কাজের ক্ষেত্র : যে কোন বিষয়ে পড়াশোনা করার আগে সেই বিষয়ে কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে জানা অত্যাবশ্যক। তাহলে সেই বিষয় সর্ম্পকে যেমন একটি ভালোবাসা তৈরি হবে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও থাকবে।পৃথিবীর সব জায়গায় উন্নত দেশগুলোতে সাইকলজিষ্টদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, কলকারখানা, খেলাধুলায়, লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ক্রিমিনাল সেকশন, ডেভলপমেন্ট হাসপাতাল, রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার সহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার সুযোগ রয়েছে। শুধু বহির্বিশ্বেই নয়, বাংলাদেশেও এখন প্রচুর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে সাইকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করার জন্য। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা থেকে শুরু করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মেন্টাল হেলথ রিসার্চার হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে একজন সাইকোলজিস্টের। আরো একটি আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে স্কুল, কলেজে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেয়ার।উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগের মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে নিকট ভবিষ্যতেই।

একজন সাইকোলজিস্টের বেতন : একজন সাইকোলজিস্টের বেতন জায়গা ভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এন্ট্রি লেভেলে কোন প্রতিষ্ঠানে ২৫,০০০-৩০,০০০ শুরু করো আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পরিশেষে বলব, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যেসম সাবজেক্টের দিন দিন বাড়ছে তারমধ্যে সাইকোলজি অন্যতম। তাই আপনার ভালো একটি ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সাইকোলজি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।


লেখক : শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়